নারীদের সম-সাময়িক বিভিন্ন সমস্যা এবং তা থেকে উত্তোরণের ক্বোরআন-ছুন্নাহ ভিত্তিক পথ ও পদ্ধতি (৩৭তম পর্ব)

উছতায আবূ ছা`আদাহ হাম্মাদ বিল্লাহ c ধারাবাহিক এই অডিও বক্তব্যে নারীদের সম-সাময়িক বিভিন্ন সমস্যা এবং এসকল সমস্যা থেকে উত্তোরণের পথ ও পদ্ধতি বিষয়ে ক্বোরআন-ছুন্নাহ্‌র আলোকে অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা পেশ
করেছেন।পারিবারিক এবং বৈবাহিক জীবনে নারীরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হওয়া, সন্তানদের লালন-পালন করা, সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবার গড়ে তোলা, ঘরের বাইরে কাজ-কর্ম করা ইত্যাদি অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
এই পর্বে উছতায হাম্মাদ বিল্লাহ c বিয়ের বয়স নির্ধারণ’ নিয়ে আলোচনা করেন, তন্মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো:-
১) ‘ইবাদাতের সাথে সম্পর্কিত সকল কিছুই ‘ইবাদাহ হিসেবে গণ্য হয়। তেমনি বিয়ের সাথে সম্পর্কিত সকল কিছুই ‘ইবাদাহ। যেমনঃ উত্তম বর ও কনে তালাশ করা, কনে দেখা, কখন বিয়ে করবেন, কয়টা বিয়ে করবেন এসবই মূলতঃ ‘ইবাদাহ এর অন্তর্ভুক্ত। তাই, যে বিষয়গুলো ‘ইবাদাহ হিসেবে গণ্য হয়, সেখানে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বা যুক্তি প্রয়োগের কোন অবকাশ নেই। ‘ইবাদাতের বিষয়গুলি সম্পূর্নরূপে আল্লাহ্‌ 0 কর্তৃক সুনির্ধারিত। কেউ শারী’য়াতের এই সীমারেখা অতিক্রম করলে সে ছূরা আত্‌ত্বালাকের ১নং আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে। আয়াতটি হলঃ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۚ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ অর্থঃ এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে।
২) বিয়ের বয়স কত বছর শুরু হবে এবং, কত বছর বয়সের পরে আর বিয়ে করা যাবে না? ক্বোরআন ভিত্তিক দলিলঃ

ক) ইছলাম যদি এক্ষেত্রে কোন বয়সসীমা নির্ধারণ করে থাকে তবে আমরা সেটাকেই অনুসরণ করব। কিন্তু, ইছলাম বিয়ের জন্য কোনও বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেয়নি।
খ) ছূরা আত্‌ত্বালাকের ৪নং আয়াতে আল্লাহ্‌ 0 বলেন, وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ ۚ وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ۚ وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا

অর্থঃ তোমাদের যে সব স্ত্রীগণ মাসিক ঋতু আসার বয়স অতিক্রম করেছে তাদের (‘ইদ্দাতের) ব্যাপারে যদি তোমাদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে তাদের ‘ইদ্দাতকাল তিন মাস, আর যারা (অল্প বয়স্কা হওয়ার কারণে) এখনও ঋতুবতী হয়নি
(এ নিয়ম) তাদের জন্যও। আর গর্ভবতী স্ত্রীদের ‘ইদ্দাতকাল তাদের সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহ্‌কে ভয় করে, আল্লাহ 0 তার কাজ সহজ করে দেন।
উক্ত আয়াত দ্বারা এটা স্পষ্ট হয় যে, যেসব মেয়েরা এখনও ঋতুবতী হয়নি তাদেরও বিয়ে হতে পারে।
গ) ছূরা আত্‌তাহ’রীমের ৫নং আয়াতে আল্লাহ্‌ 0 ইরশাদ করেছেন-

عَسَىٰ رَبُّهُ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبْدِلَهُ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ مُسْلِمَاتٍ مُؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ ثَيِّبَاتٍ وَأَبْكَارًا

অর্থঃ তিনি (নাবী)যদি তোমাদের সবাইকে তালাক্ব দিয়ে দেন তবে সম্ভবতঃ তাঁর প্রতিপালক তোমাদের পরিবর্তে তাঁকে দিবেন তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী- যারা হবে আত্মসমপর্ণকারিণী মু‘মিনা অনুগতা, তাওবাহকারিণী, ‘ইবাদাতকারিণী, রোযা
পালনকারিণী, অকুমারী ও কুমারী।

উক্ত আয়াতের শেষে কুমারী বলা হয়েছে। এখানে কোন বয়সসীমা বলা হয়নি। তাই, আয়াত দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মেয়েদের বিয়ের জন্য কোনও বয়সসীমা নির্দিষ্ট নেই।
ঘ) ছূরা আন্‌নিছার ৩নং আয়াতে আল্লাহ্‌ 0 ইরশাদ করেছেন-

وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ

অর্থঃ যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, (নারী)ইয়াতীমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্য হতে নিজেদের পছন্দমত দুই-দুই, তিন-তিন ও চার-চার জনকে বিবাহ করো।

এখন এই আয়াতটা দলীল হবার পিছনে সাহীহ বুখারির একটি হাদিছ রয়েছে। সেটি হলো, ‘উরওয়াহ ইবনে যুবাইর 3 ‘আয়িশাহ-কে (f) উক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
‘আয়িশাহ f তাঁকে বলেন, একজন ইয়াতীম মেয়ে তার অভিভাবক এর নিকট থাকে। তখন ওই অভিভাবক যদি সেই ইয়াতীম মেয়েটিকে এই চিন্তাবশতঃ বিয়ে করতে চায় যে, উপযুক্ত মোহর না দিয়ে বরং নিজের ইচ্ছামত সামান্য মোহর
দিয়ে তাকে বিয়ে করে নেবে আর এতে করে সে মেয়েটির সম্পদেরও মালিক হয়ে যাবে। তাহলে তার জন্য উচিত অন্য মহিলাদের বিয়ে করা।

বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে আয়াতটি কিভাবে দলীল হল?
উক্ত আয়াতে এতিম কথাটি বলা হয়েছে। আর এতিম তাকেই বলা হয়, যে এখনো প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি। এই ব্যাপারে কার কোন দ্বিমত নেই। এই তিনটি আয়াত থেকে সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে ভাবে প্রমাণিত হয় যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরও বিয়ে করা
যায়। হাদীছ ভিত্তিক দলীলঃ

ক) সাহীহ বুখারী ও সাহীহ মুছলিমের হাদিছ থেকে জানা যায় যে, রাছূলুল্লাহ 1 এর সাথে ‘আয়িশাহ f এর বিয়ে মাত্র ছয় বছর বয়সে হয়েছে। এবং, তিনি নয় বছর বয়সে স্বামীর বাড়িতে এসেছিলেন। এর দ্বারা
প্রমানিত হয় যে, একটি ছোট শিশুকেও বিয়ে করা যায়।
খ) অপর আরেকটি হাদীছে এসেছে, ‘উমার h তার কন্যাকে বিয়ের করার প্রস্তাব নিয়ে পালাক্রমে আবু বাকর 3 ও ‘উছমান 3 এর কাছে গিয়েছিলেন। যদিও এরা দুইজনই ‘উমার h থেকে বয়সে
বড় ছিলেন। এ ছাড়া,রাছূলুল্লাহ 1 ও ‘আয়িশাহ h এর বয়সের পার্থক্য ছিল ৪ গুন।
গ) অন্য আছার থেকে জানা যায় যে, ‘উছমান 3 তার খিলাফতের সময়ে একদা ইবনে মাছ’উদ 3 কে বলেন, আপনাকে একটি কুমারী মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেই।এতে আপনি কিছু ভুলে গেলে সে আপনাকে স্মরণ
করিয়ে দিতে পারবে। উল্লেখ্য যে, ইবনে মাছ’উদ 3 অনেক বয়ঃবৃদ্ধ ছিলেন।
ঘ) ‘উমার 3 ‘আলী 3 এর মেয়ে উম্মে কুলছুম h কে বিবাহ করেছিলেন। এক্ষেত্রেও কুলছুম h এর পিতা (‘আলী 3) থেকেও ‘উমার 3 বয়সে বড় ছিলেন।

তাই বর্তমান সময়ের মুছলিমদের উচিত, এসব বিষয়ে যেকোনো রকমের সমালোচনা ও ঠাট্টা-মশকরা করা থেকে বিরত থাকা।
ইজমা‘ ভিত্তিক দলীলঃ

ক) এ ব্যাপারে মুছলমানদের মধ্যে ঐক্যমত্য রয়েছে যে, বাবা চাইলে তার ছোট মেয়েকেও বিয়ে দিতে পারে।
খ) মুহাম্মাদ ইবনে নসর আল মারুযী o বলেছেন, সমাজে এই বিষয়ে একমত রয়েছে যে, বাবা চাইলে তার ছোট্ট ছেলে বা মেয়েকে বিয়ে দিতে পারেন। তিনি এটাও বলেছেন যে, সন্তানরা চাইলেও বড় হয়ে এই বিয়ে ভেঙ্গে দিতে
পারবে না কিংবা একথা বলতে পারবে না যে, এই বিয়ে হয়নি বা, এই বিয়ে আমরা মানিনা। তবে, যদি পরবর্তীতে তালাক্ব দিয়ে দেয়, তাহলে সেটা করতে পারে, সেটা ভিন্ন কথা।
গ) ইমাম ইবনে মুনযির o একই কথা বলেছেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি কেবল এই শর্তটি জুড়ে দিয়েছেন যে, উপযুক্ত পাত্রের নিকট বিয়ে দিতে হবে, তবে তা জায়েয হবে। ইমাম নববী o ও একই অভিমত পোষণ করেছেন।
ঘ) ইবনু ক্বোদামাহ o তার আল মুগনী গ্রন্থেও এই মতই পোষণ করেছেন।

৩) দেরী করে বিয়ে করার অনিষ্ট গুলো কি কি?

ক) অনেক সময় দেখা যায় যে, উপযুক্ত পাত্র খুজে পাওয়া যায়না।
খ) বিয়ের জন্য বয়স নির্ধারণ করে রাষ্টীয় আইন পাশ করার মাধ্যমে মানুষকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করা হয়। কারন, অনেক অভিভাবক সঠিক সময়ে তার সন্তানের বিয়ে দেওয়ার জন্য বয়স বাড়িয়ে মিথ্যা সার্টিফিকেট তৈরি করেন।
গ) সবচেয়ে বড় কথা হলো বিয়ের জন্য বয়স সীমা নির্ধারণের মাধ্যমেস , আল্লাহ্‌ 1 যে বিষয়টাকে উন্মুক্ত রেখেছেন, সেটাকেতারা সীমাবদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

৪) এরপর তথাকথিত অনেক বুদ্ধিজীবীর ভুল যুক্তিগুলো শাইখ খন্ডন করেছেন।
৫) অল্প বয়সী ছেলের সাথে বয়স্ক মহিলার বিবাহ দেওয়ার ব্যাপারে ইছলাম কি বলে?
এটিকেও ইসলাম অনুমোদন করে। যেমন,

ক) রাছূলুল্লাহ 1 তার প্রায় দিগুন বয়সী খাদিজাহ f কে বিয়ে করেছিলেন।
খ)আবুল হাফস ইবনে মুগিরাহ 3 যখন ফাতিমাহ বিনতে ক্বাইছ h কে তালাক্ব দিলেন, তখন উছামাহ বিন যাইদ-কে (3) রাছূলুল্লাহ 1 নির্দেশ দিলেন ফাতিমা বিনতে কাইছ- কে বিয়ে
করার জন্য। অথচ উছামাহ 3 এর বয়স তখন ২০ এরও কম আর ফাতিমাহ বিনতে কাইছ h এর বয়স তখন তার প্রায় দ্বিগুণ।

৬) কত বছর বয়সে একটি ছেলে বা মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়?

ক) এর সুনির্দিষ্ট কোনও বয়সসীমা নেই। দেশ, এলাকা, পাত্রভেদে তারতম্য হতে পারে।
খ) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স কতটুকু সেটি নির্ধারিত নয়। কিন্তু, ছুন্নাহ দ্বারা সর্বোচ্চ বয়সসীমা সম্পর্কে জানা যায়। সাহীহ বুখারী ও সাহীহ মুছলিমে বর্ণিত হাদীছ থেকে জানা যায় যে, উহুদের যুদ্ধের সময় ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার
h কে রাছূলুল্লাহ 1 এর নিকট নিয়ে আসা হল। কিন্তু, রাছূলুল্লাহ 1 তাকে জিহাদের অনুমতি দেননি। তখন তার বয়স ছিল ১৪ বছর। পরে খন্দকের যুদ্ধের সময় তার ১৫ বছর হওয়ার পর তাকে যুদ্ধের
অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
‘উমার ইবনে ‘আব্দিল ‘আযীয o এর খিলাফাতের সময় নাফে‘ o তাকে এই হাদিছটি বর্ণনা করেন। পরে ‘উমার ইবনে ‘আব্দিল ‘আযীয o এটাকেই প্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা হিসেবে ঘোষণা করেন।
গ) ‘উলামাদের ‘ইজমা হল, মেয়েদের ঋতুবতী হওয়াটা তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ‘আলামত।

 

ক্লাস শেষে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করা হয়:-
১) السلام عليكم, শাইখ!একজন মুমিন ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছেন। এবং, উনি স্ত্রী, ১ ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে গেছেন। ছেলে ও মেয়ে ৪ জনই প্রাপ্ত বয়স্ক। উনি মারা যাওয়ার সময় বেশ কিছু সম্পদ রেখে গেছেন।উনি জীবিত অবস্থায়ই সব মেয়েদের
বিয়ে দিয়ে গেছেন। ছেলের বয়স আনুমানিক ২৫ বছর। শারি‘য়াতের দৃষ্টিতে এখন উনার পরিবারের অভিভাবক কে? এবং, উনার এই সম্পদের কি করা উচিত বা, বন্টন কি ভাবে করা উচিত? এখানে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী কি চাইলে জোর করে
আমৃত্যু সম্পদের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখে দিতে পারেন?
উনার স্ত্রী কি চাইলে সম্পদের সমান ভাগ বা বেশীরভাগ মেয়েদের দিতে পারবেন? এই সম্পদের উপর উনার স্ত্রীর এখতিয়ার কতটুকু? ছেলের আর মেয়ের হাক্ব কতটুকু?
২) বিদ’আতের দিকে আহবানকারী এবং বিদ’আতের আনুসারীদের মধ্যে তফাৎ কি? যেসকল তাবলীগীরা আমাদের কাছে তাদের দা‘ওয়াহ নিয়ে আসে, তাদেরকে কি বিদ’আতের দিকে আহবানকারী হিসেবে গণ্য করা যায়?
৩) السلام عليكم । সালাতের ক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে যে কোনও পার্থক্য নেই, এই বিষয়ে ‘উস্তায একটু বললে ভালো হত। দেখা যায়, এই বিষয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন। কিন্তু সঠিকভাবে বলতে পারিনা। বারাকাল্লহু ফিক। আমীন।

Subscribe to our mailing list

* indicates required
Close